Blog
শিশুর টিকা সময়সূচি: বাংলাদেশে জন্ম থেকে ২ বছর
শিশুর টিকা সময়সূচি: বাংলাদেশে জন্ম থেকে ২ বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ গাইড
মেয়ে হওয়ার এক সপ্তাহ পর থেকেই তাসনিমের মাথায় একটাই দুশ্চিন্তা—কোন টিকা কখন দিতে হবে? হাসপাতাল থেকে একটা কার্ড দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাতে সংক্ষিপ্ত কিছু নাম আর তারিখ লেখা, যেগুলোর মানে তিনি ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। শাশুড়ি বললেন “সব টিকা তো একসাথেই হয়ে যায়”, প্রতিবেশী বললেন “নয় মাসে একটা বড় টিকা আছে”, আর তাসনিম ভাবছিলেন—যদি একটা তারিখ ভুলে যাই, তাহলে কি মেয়ের ক্ষতি হবে?
এই দুশ্চিন্তা একদম স্বাভাবিক, কারণ টিকা শিশুর স্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাগুলোর একটি। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় সাজিয়ে দেব বাংলাদেশের শিশুর টিকা সময়সূচি—জন্ম থেকে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত কোন বয়সে কোন টিকা দেওয়া হয়, কেন দেওয়া হয়, এবং একটি ডোজ পিছিয়ে গেলে কী করবেন। উদ্দেশ্য একটাই: বিষয়টা যেন আপনার কাছে আর জটিল বা ভীতিকর মনে না হয়।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) ও ইউনিসেফের প্রকাশিত নির্দেশনার আলোকে তৈরি। সময়সূচি বা টিকার তালিকা মাঝেমধ্যে হালনাগাদ হতে পারে, তাই আপনার শিশুর নির্দিষ্ট সূচির জন্য সবসময় নিকটস্থ EPI কেন্দ্র বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শকেই চূড়ান্ত হিসেবে ধরুন।
শিশুর টিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
টিকা মূলত শিশুর শরীরকে আগেভাগে “প্রশিক্ষণ” দেয়। রোগের জীবাণুর একটি নিরাপদ, দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় রূপ শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যাতে শরীর সেই রোগ চিনে রাখে এবং পরে আসল জীবাণু এলে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা EPI-এর মাধ্যমে সরকার বিনামূল্যে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী রোগের টিকা দেয়। যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি, নিউমোনিয়া, হাম ও রুবেলার মতো রোগ থেকে এই টিকাগুলো শিশুকে রক্ষা করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—টিকা কেবল একটি শিশুকে নয়, পুরো সমাজকে রক্ষা করে। যখন বেশিরভাগ শিশু টিকা পায়, তখন রোগ ছড়ানোর সুযোগ কমে যায়, যা এমন শিশুদেরও রক্ষা করে যারা কোনো কারণে টিকা নিতে পারেনি।
বাংলাদেশে EPI টিকা সময়সূচি: এক নজরে
বাংলাদেশের EPI কর্মসূচিতে জন্ম থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে মূল টিকাগুলো দেওয়া হয়। নিচের টেবিলে সাধারণ সময়সূচিটি সহজভাবে দেওয়া হলো:
| বয়স | টিকা | কোন রোগ থেকে সুরক্ষা |
| জন্মের সময় | BCG | যক্ষ্মা (TB) |
| ৬ সপ্তাহ | পেন্টাভ্যালেন্ট (১ম), OPV (১ম), PCV (১ম), IPV (১ম) | ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি, Hib, পোলিও, নিউমোনিয়া |
| ১০ সপ্তাহ | পেন্টাভ্যালেন্ট (২য়), OPV (২য়), PCV (২য়) | উপরের একই রোগসমূহ (২য় ডোজ) |
| ১৪ সপ্তাহ | পেন্টাভ্যালেন্ট (৩য়), OPV (৩য়), PCV (৩য়), IPV (২য়) | উপরের একই রোগসমূহ (৩য় ডোজ) |
| ৯ মাস | MR (১ম), TCV | হাম, রুবেলা, টাইফয়েড |
| ১৫ মাস | MR (২য়) | হাম ও রুবেলা (২য় ডোজ) |
এখানে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত নামের মানে জেনে রাখা ভালো। পেন্টাভ্যালেন্ট একটি টিকাতেই পাঁচটি রোগের সুরক্ষা দেয়—ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি এবং Hib। OPV হলো মুখে দেওয়া পোলিও টিকা, আর IPV হলো ইনজেকশনে দেওয়া পোলিও টিকা। PCV নিউমোনিয়া থেকে রক্ষা করে, MR হাম ও রুবেলা থেকে, এবং TCV টাইফয়েড থেকে।
জন্ম থেকে ধাপে ধাপে: কোন সময়ে কী
জন্মের সময়
জন্মের পরপরই দেওয়া হয় BCG টিকা, যা যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করে। বাংলাদেশ যক্ষ্মাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এই টিকা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেওয়াই ভালো।
৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ
এই তিন ধাপে শিশু পায় পেন্টাভ্যালেন্ট, OPV ও PCV টিকার পরপর তিনটি ডোজ। পোলিওর ইনজেকশন (IPV) দেওয়া হয় ৬ ও ১৪ সপ্তাহে। একাধিক ডোজ দেওয়ার কারণ হলো, পরপর ডোজেই শরীরে পূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে—একটি ডোজ যথেষ্ট নয়।
৯ মাস
এই সময় দেওয়া হয় হাম ও রুবেলার প্রথম MR ডোজ এবং টাইফয়েডের TCV টিকা। হাম ছোট শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে, তাই এই ডোজটি সময়মতো দেওয়া বিশেষভাবে জরুরি।
১৫ মাস
হাম ও রুবেলার দ্বিতীয় MR ডোজ এই বয়সে দেওয়া হয়, যা প্রথম ডোজের সুরক্ষাকে পূর্ণ করে।
EPI-বহির্ভূত কিছু ঐচ্ছিক টিকা
উপরের টিকাগুলো সরকারিভাবে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এর বাইরেও কিছু টিকা আছে যেগুলো ঐচ্ছিক এবং সাধারণত বেসরকারি পর্যায়ে, নির্দিষ্ট খরচে পাওয়া যায়।
এর মধ্যে রয়েছে রোটাভাইরাস (ডায়রিয়া থেকে সুরক্ষা), চিকেনপক্স বা জলবসন্ত, হেপাটাইটিস এ, এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা। এই টিকাগুলো আপনার শিশুর জন্য প্রয়োজন কি না, তা নির্ভর করে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর—তাই এগুলো নেওয়ার আগে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন।
👉 আরও পড়ুন: শিশুর প্রথম শক্ত খাবার: ৬ মাস থেকে কীভাবে শুরু করবেন
👉 আরও পড়ুন: নবজাতকের ত্বকের যত্ন: শীত ও গরমে র্যাশ প্রতিরোধের উপায়
👉 আরও পড়ুন: শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ: জন্ম থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ গাইড
টিকা দেওয়ার আগে ও পরে যা মনে রাখবেন
টিকাদানকে সহজ ও নিরাপদ রাখতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন:
- টিকা কার্ড সংরক্ষণ করুন: EPI কার্ডটি যত্ন করে রাখুন এবং প্রতিবার সাথে নিয়ে যান; এটিই আপনার শিশুর টিকার সরকারি রেকর্ড।
- হালকা জ্বর স্বাভাবিক: টিকার পর হালকা জ্বর, ইনজেকশনের জায়গায় লালভাব বা শিশুর একটু খিটখিটে হওয়া সাধারণ প্রতিক্রিয়া, যা কয়েক দিনে সেরে যায়।
- অসুস্থ থাকলে জানান: টিকার দিন শিশু বেশি অসুস্থ থাকলে টিকাদান কর্মীকে জানান; তাঁরা প্রয়োজনে পরামর্শ দেবেন।
- ডোজ বাদ পড়লে থামবেন না: কোনো ডোজ পিছিয়ে গেলে পুরো সূচি নতুন করে শুরু করতে হয় না; দ্রুত EPI কেন্দ্রে গিয়ে বাকি ডোজ চালিয়ে নিন।
- গুরুতর প্রতিক্রিয়ায় দ্রুত ব্যবস্থা: টিকার পর অস্বাভাবিক কিছু—যেমন দীর্ঘ কান্না, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট—দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
- পরের তারিখ লিখে রাখুন: পরবর্তী টিকার তারিখ ফোনে বা ক্যালেন্ডারে নোট করে রাখুন, যাতে ভুলে না যান।
একটি ডোজ পিছিয়ে গেলে কী হবে
অনেক অভিভাবক ভাবেন, একটি তারিখ মিস হলে বুঝি সব শুরু থেকে করতে হবে বা টিকা আর কাজ করবে না। বাস্তবে এমনটা নয়।
কোনো ডোজ নির্ধারিত সময়ে দেওয়া না গেলে, যত দ্রুত সম্ভব সেটি দিয়ে বাকি সূচি এগিয়ে নেওয়া হয়—পুরোটা নতুন করে শুরু করার দরকার হয় না। তবে দেরি যত কম হয়, সুরক্ষা তত ভালো। তাই তারিখ পিছিয়ে গেলে দুশ্চিন্তা না করে দ্রুত নিকটস্থ EPI কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন এবং টিকা কার্ডটি সাথে নিন, যাতে কর্মীরা দেখে বাকি ডোজের পরিকল্পনা করতে পারেন।
বর্তমানে দেশে হাম প্রতিরোধে বিশেষ MR ক্যাম্পেইনের মতো উদ্যোগও সময়ে সময়ে চালানো হয়। এমন কোনো ক্যাম্পেইন চললে আপনার শিশু সেটির আওতাভুক্ত কি না, তা নিকটস্থ কেন্দ্র থেকে জেনে নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. EPI টিকা কি সত্যিই বিনামূল্যে?
হ্যাঁ। বাংলাদেশ সরকারের EPI কর্মসূচির আওতাভুক্ত টিকাগুলো সরকারি কেন্দ্রে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কিছু ঐচ্ছিক, EPI-বহির্ভূত টিকা অবশ্য খরচসাপেক্ষ হতে পারে।
২. টিকার পর জ্বর এলে কি চিন্তার কারণ?
সাধারণত না। টিকার পর হালকা জ্বর ও ইনজেকশনের জায়গায় সামান্য ব্যথা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে জ্বর বেশি হলে, খিঁচুনি হলে বা শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৩. টিকা কোথায় দেওয়া যায়?
সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক ও নির্ধারিত EPI কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হয়। নিকটস্থ কেন্দ্রের তথ্য স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন।
৪. টিকা কার্ড হারিয়ে গেলে কী করব?
দ্রুত যে কেন্দ্র থেকে টিকা নিচ্ছিলেন সেখানে যোগাযোগ করুন; তাঁরা রেকর্ড দেখে পরবর্তী পরিকল্পনায় সাহায্য করতে পারেন। ভবিষ্যতে কার্ডের একটি ছবি ফোনে তুলে রাখা ভালো অভ্যাস।
শেষ কথা
তাসনিম শেষ পর্যন্ত জটিল হিসাব বাদ দিয়ে সহজ একটা কাজ করলেন—টিকা কার্ডটা ফ্রিজের গায়ে আটকে রাখলেন, আর পরের তারিখটা ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখলেন। এখন আর তাকে মনে রাখার চাপ নিতে হয় না; নির্দিষ্ট দিনে মেয়েকে নিয়ে কেন্দ্রে যান, ব্যস।
শিশুর টিকা সময়সূচি প্রথমে জটিল মনে হলেও আসলে এটি একটি সাজানো, ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া। প্রতিটি ডোজের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ আছে, আর সরকারি EPI কর্মসূচি সেই পুরো পথটাই বিনামূল্যে সহজ করে দিয়েছে।
আপনার কাজ শুধু তারিখগুলো মনে রাখা আর সময়মতো কেন্দ্রে যাওয়া। আর যেকোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন বা দ্বিধায়—কোন টিকা, কখন, বা কোনো ডোজ নিয়ে—নিকটস্থ EPI কেন্দ্র বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শই হবে আপনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।







